০৫ এপ্রিল ২০২৫ শনিবার, ০৯:৩২ পিএম
ডেস্ক রিপোর্ট
শেয়ার বিজনেস24.কম
![]() |
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান এখন শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, এর ফলে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধেও এখন ব্যর্থ হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করের বকেয়া, বিক্রি বাড়াতে না পারা, উৎপাদন খরচের অতিরিক্ত চাপ এবং উৎপাদনের বহুমাত্রিক সীমাবদ্ধতা। এসব সমস্যার সবই কোম্পানির হালনাগাদ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবসার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানির শেয়ারদর বড় পরিসরে বেড়ে যায়। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩-এ শেয়ারদর ছিল ৮ টাকা, যা গত ৪ ফেব্রুয়ারি ১৫ টাকা ১০ পয়সায় পৌঁছায়। এই সময়ের মধ্যে শেয়ারদর কিছুটা কমে ১৩ টাকায় লেনদেন হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ২১ জানুয়ারি কোম্পানির শেয়ারদরের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ জানতে চায় এবং ২৬ জানুয়ারি কোম্পানি জানায়, কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারদর বেড়েছে।
তবে, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ৩০ জুন ২০২৪ সালের মধ্যে কোম্পানির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা সংকট আরও বাড়াচ্ছে। কোম্পানি ঋণের কিস্তি পরিশোধেও ব্যর্থ এবং এর মধ্যে রয়েছে ২৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, কোম্পানি ঋণের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে ব্যাংককে চিঠি পাঠালেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে নিরীক্ষক আরও বলেছেন, কোম্পানি বিভিন্ন ঋণদাতার কাছ থেকে ৮৮ লাখ ১৭ হাজার ২৫২ টাকা ঋণ নিয়েছে, তবে ঋণের বিশদ তথ্য এবং সময়সীমা সরবরাহ করা হয়নি, ফলে এগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোম্পানি করবাবদ ২৮ কোটি ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৫২ টাকা প্রভিশন রেখেছে, তবে এটি ২০২২ সালের ৩০ জুনের পর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। এর পাশাপাশি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০০৭-০৮ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত প্রায় ৯৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা দাবি করেছে, যা এখনো মেটানো হয়নি। কোম্পানি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কোম্পানি যেসব ব্যয় করেছে, তার সঠিক প্রমাণ দেখাতে পারেনি। অগ্রিম প্রদান, আমানত, পূর্বপরিশোধিত ব্যয় এবং পাওনার সঠিক তথ্য বা প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি। নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, কোম্পানি প্রায় সব ব্যয় নগদে পরিশোধ করেছে, ফলে লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া, কাঁচামাল কেনায় উৎসে কর কর্তন হয়নি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্তৃত কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।
কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে জনতা ব্যাংক থেকে ২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। কিন্তু এর বিপরীতে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ব্যাংক সার্টিফিকেট দিতে পারেনি। এ ছাড়া ব্যাংকে চিঠি দিয়েও ওই ঋণের বিষয়ে কোনো সাড়া পায়নি নিরীক্ষক। যে কোম্পানিটি ঋণের কিস্তি প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে।
নিরীক্ষক জানিয়েছে, গ্রাহকদের কাছে ৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা পাওয়া যাবে বলে আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি দিতে পারেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। যে অর্থ দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসা হচ্ছে। যা আদায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো প্রভিশনিং গঠন করেনি। এর মাধ্যমেও সম্পদ বেশি দেখানো হচ্ছে।
এদিকে স্পেয়ার পার্টস অ্যান্ড সাপ্লাইস হিসেবে দেখানো ১ কোটি ২৮ লাখ টাকার বিপরীতেও কোনো প্রমাণাদি পায়নি নিরীক্ষক। যা সম্পদ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসা হচ্ছে। তবে ওই সম্পদ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো প্রভিশনিং গঠন করেনি। এর মাধ্যমেও সম্পদ বেশি দেখানো হচ্ছে।
এই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ লেনদেন নগদে করে। যাতে ওই লেনদেনের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যে নগদ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যয় কম বা বেশি দেখানো যায়। এ ছাড়া আয়ও বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো যায় বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। যা হরহামেশ করাও হয়।
কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে অগ্রিম প্রদান হিসেবে ২৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। এরমধ্যে ২৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর প্রদান। এ বিষয়ে কোনো প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি নিরীক্ষককে। এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএলের মতো প্রতিষ্ঠানের ফি জমা দেয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।
২০১৩ সালে শেয়ারবাজারে আসা কোম্পানিটিতে এখনো আইপিও আবেদনকারীদের ৬০ লাখ টাকা পড়ে রয়েছে। আইপিওতে আবেদন করে শেয়ার না পাওয়া সত্ত্বেও ওই টাকা কোম্পানিতে রয়ে গেছে। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে ৯ লাখ টাকার অবণ্টিত লভ্যাংশ রয়েছে। কিন্তু এ অর্থ বিএসইসির ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে স্থানান্তর করেনি।
শেয়ারবিজনেস24.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।